ভালোবাসা মানে এই না কেবলই শব্দ, ভালোবাসা মানে একটু নির্মলতা

বাস চলছে। একটু পর পর ই থামে। যাত্রী উঠে। সিট খালি থাকে। সিট দখল হয়। সীমিত সিটের জন্য সবার ভাগ্যে সিট জোটে না। যেতে হয় দাড়িয়ে অনেককেই। তাই বুদ্ধিমান(!) সেই, যে সবাইকে ফাঁকি দিয়ে সিট দখল করতে পারে। এই চালাকিটুকু যে জানে না, সে হয় বোকা। সিট দখল করতে গিয়ে আমরা অজান্তেই শিখছি ঘৃণা করা। পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা হারানো শিখছি, খুব ধীরে ধীরে। একটা সিট না পেলে, যে চালাকি করে সিট দখলে নিলো, তার প্রতি তীব্র ঘৃণা আর ক্ষোভ পুষতে শিখছি। কখনো তর্ক জুড়ে দিচ্ছি, বা কখনো ঝগড়া শুরু করে দিচ্ছি। মন হচ্ছে হিংসাতে পূর্ণ। তবে প্রক্রিয়াটা খুব ধীরে হচ্ছে। একই ব্যাপার ঘটছে প্রচন্ড ভিড়ের মধ্যে প্রায় যুদ্ধ করে গাড়ী উঠার সময়ও।

ব্যংকে টাকা দিতে আসছি। লম্বা লাইন। স্বভাবতই উপায় খুজতে থাকি আমরা। চালাকি করি, কিভাবে লাইনে না দাড়িয়ে ব্যাংকের কাজ শেষ করা যায়। এক্ষেত্রে লাইনে দাড়ানো লোকগুলো যে তীব্র ঘৃণা ক্ষোভ এর দৃষ্টিতে তাকায় তা ভয়াবহ। তা যদি কেও অনুভব করতে পারে, পুড়ে যেত।

ট্রেন কিংবা বাসের টিকিট লাইনে দাড়িয়েই কাটতে হবে। এখানেও যত চালাকিপনা। নানা কথা নানা ছল। ঘৃণা করা শিখছি। অন্যকে হিংসা করা শিখছি। ক্ষোভ পুষে রাখছে।

বাজারে কিংবা দোকানে, মার্কেটে কিংবা বেঁচাকেনায় যেখানেই সবাইকে হারিয়ে নিজেকে জেতানোর প্রচেষ্টা। চালাকির কি প্রাণান্তর চেষ্টা। অথচ এর মধ্যে ঘৃণা করতে শিখছি। হিংসুটে হচ্ছি।

বাচ্চাদের স্কুলের আন্টিরা-আংকেলরা। সন্তানদের এগিয়ে রাখতে কি না প্রচেষ্টা। অন্যদের ঘৃণা করতে শিখছেন, শেখাচ্ছেন। চালাকি করানো শিখছেন, শেখাচ্ছেন।

শিক্ষক আরেক শিক্ষককে ঘৃণা করছেন, করাচ্ছেন। শিল্পী আরেক শিল্পীকে ছোট করছেন, করাচ্ছেন। আমরা ঘৃণা করা শিখছি সবাই, ধীরে ধীরে। খুব ধীরে ধীরে। মন বিষিয়ে যাচ্ছে। মন ভারী হয়ে যাচ্ছে। পরম কাছের বন্ধুটিও চালাকি করা শিখে গেছে। জিতে যাওয়া শিখে গেছে। অথচ, সে শিখে গেছে ঘৃণা করা, ক্ষোভ পুষে রাখা। হিংসা করা।

আমরা সবাই আস্তে আস্তে অচেতন দেশে যাচ্ছি। সেখানে কোন শব্দ নাই। মানুষগুলো কেবলই চুপ। কোন সাড়া নাই। পরিবেশটা কেবলই অন্ধকার। সেখানে মানুষ কেবল ঘৃণা করে, ক্ষোভ পুষে রাখে, হিংসা করে।

এই যে, পড়ার বইগুলো, এই যে সময় কাটানোর বিষয়গুলো, এই যে মাতামাতি করার বিষয়গুলো, এই যে আমাদের বর্তমান চারপাশ, সব একজোট হয়ে বন্ধ করে দিচ্ছে মনের দরজা জানালা। আর ধীরে ধীরে আমরা হিংসা করা শিখছি, ক্ষোভ পুষে রাখছি। ঘৃণা করা শিখছি।

এর বিপরীত ভাবতে হবে। ভাবতে হবেই। বাসের সিটের জন্য প্রতিযোগিতা না। একটু ধৈর্য্য। একটু বিনয়। একটু ভদ্রতাবোধ। বিশ্বাস রাখুন শান্তি পাবেন। দাড়িয়ে থেকে হয়তো দেখলেন আপনার সামনের প্রাপ্য সিটটা চালাকি করে কেও নিলো, ঘৃণা করবেন না। একটু হাসুন। 🙂 লাইনে দাড়িয়ে আছেন। কেও লাইন ভাঙ্গলো। তাকে ভদ্রভাবে বলুন। হয়তো শুনবে না। কিন্তু ভালো ব্যবহার তার মনে দাগ কাটবেই। জানি, অনেক কঠিন। চেষ্টা করা যেতে পারে। আপনার সন্তানকে কেন ফাস্ট করতেই হবে। তাকে শেখান না একটা গান, একটা কবিতা। বাজাতে শেখান বাঁশি কিংবা হারমোনিয়াম। তাকে প্রথম হতেই হবে সেটা কোথাও লেখা নাই। 🙂 হয়তো সে লাস্ট হয়েও বড় হয়ে ফাস্ট হওয়ার মতন কাজই করবে। বন্ধুরা কেন আরেক বন্ধুকে পচাবে? বন্ধুকে একটু প্রশংসা করুন না। বন্ধুদের আড্ডাতে কাউকে খাটো না করে কথা না বলে দেখুন না কত শান্তি পাওয়া যায়। 🙂 আপনি শিক্ষক, কেন আরেকজন শিক্ষকের বদনাম করতে হবে। আপনি আপনাকে ছাড়িয়ে যান না। মুগ্ধ করে তুলুন না আপনার ছাত্রদের। এক শিল্পী কেন আরেক শিল্পীকে ছোট করবে। একটু কদর করে দেখুনই না। শান্তি পেতে হলে ভালোবাসতে হবে।

ভালোবাসা মানে এই না কেবলই শব্দ
ভালোবাসা মানে একটু নির্মলতা,
একটু সজীবতা, চঞ্চলতা, ছন্দ।
ভালোবাসা মানেই বিনয়, নম্রতা
হিংসা, ক্ষোভ আর ঘৃণার নিয়ন্ত্রণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *