শ্রীপুরে উল্কাপাত পর্যবেক্ষণ ক্যাম্প অভিজ্ঞতা

দিন কাল মোটেও যাচ্ছে না ভালো। তার মধ্যে প্রকৃতির খেয়াল হয়েছে অদ্ভুদ। আমার জন্মদিনকার একদিন বাদেই উল্কাপাত হবে। হ্যাঁ, ঠিকই অনুমান করেছেন, ২০ তারিখের উল্কাপাত এবং অনুসন্ধিৎসু বন্ধুদের সাথে উল্কাপাত পর্যবেক্ষণের কথাই বলছি। স্ট্যাটাস দীর্ঘ হবে। নিজ দায়িত্বে পড়বেন।

দিপুকে সাথে নিয়ে ভাবছিলাম কি করবো কি করা যায়! ক্লাবের অন্য কারো মধ্যেও সিরিয়াস কোন উৎসাহ পাচ্ছিলাম না। কারণ, উল্কাপাত তো খুব সাধারণ ঘটনাই। এটা এতো ঘটা করে দেখার কি আছে! ভাবলাম, জ্যোতির্বিজ্ঞান টিমটা কে একটা ঠ্যালা দিলে কেমন হয়? টিম টা কেমন যেন ঝিম মেরে বসে আছে! দিপু রাজি হয়ে গেল। কোথায় এবং কিভাবে করা হবে তার একটা মৌখিক পরিকল্পনা হয়ে গেল। জ্যোতির্বিজ্ঞান বিভাগ এর সভাপতি আমাদের বেনু ভাই। বড় বড় প্রোগ্রাম করতে শ্রীপুরে টানলেও আমরা যেতে চাই না, অথচ উল্কাপাত পর্যবেক্ষণে আমাদের উৎসাহ দেখে উনিও খুশি। আমরা প্ল্যান করলাম। বাজেট করলাম। দূরে কথাও গেলেই, আমাদের মনে দুলুনি উঠে যায়। সবাই যেতে চাই। কাজ করি আর না করি। তাই দিপু আর আরাফাত কিছু হোমওয়ার্ক দিলো সদস্যদের। কেও করলো কেও করলো না। কারণ সময় কম ছিল।

সাধারণ কোন ভ্রমণ এ গেলে, প্ল্যান থাকে ২টা। ক্ষেত্র বিশেষ বেশিও থাকে। আমার আর দিপুর মাথায় প্ল্যান ছিল ২টাই। প্ল্যান এ সবাই জানতো। প্ল্যান বি সবাই জানতো না। প্ল্যান এ অনুসারে, বিকাল ১টায় ক্লাবে রিপোর্ট করার কথা থাকলেও আমি দেরি করি। ইন্টারনেট সমস্যার কারণে আমার কিছু কাজ শেষ করতে দেরি হয়। তাড়াহুড়া করে গরম এক প্লেট ডাল ভাত খেয়ে অচ বন্ধুদের রিপোর্ট করি যে আমি আসছি!
ক্লাব থেকে রেল স্টেশনের দিকে রওনা হতে হবে, কিন্তু তা বিলম্বিত হচ্ছিল। কারণ মা আর ছেলের বিদায়পর্ব শেষ যেন হতেই চায় না। ছেলে প্রথমবারের মতন যাচ্ছে একাকি কোন ক্যাম্পে। মা যারপরনাই ভীত আতংকিত সব কিছু। মা কে যথাযথ আশ্বাস এবং ছেলেকে যথেষ্ঠ সাহসিকতা দিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করলাম। এই মা এবং ছেলে হচ্ছেন দোলা আপা এবং ছোট্ট ব্রুণো এখন বড় হয়ে গেছে!

তিন সিনিয়রই গেলেন শান্তিনগরে। তখন বুজতে পারি নাই কি ভুলটা করে ফেলেছি। অবশ্য টেলিস্কোপ আনতে ওই তিন জনরই যাওয়ার দরকার ছিল। ভুল টা হলো, ছোটদের যে টিমটাকে টিকিট কাটতে স্টেশন পাঠানো হয়েছিল তাদের সর্দার করে পাঠান হয়েছিল নাজমুলকে। আর নাজমুলকে পটিয়ে ছোটরা রেল স্টেশনের মতন নোংরা হাগু মুতু করার জায়গায় নেমে গেছিলো ফটোগ্রাফি করতে! শান্তিনগর থেকে টেলিস্কোপ এনে প্লাটফরমে তার কান্ড গল্প শুনে হাসতে হাসতে শেষ। গু এর গন্ধে যেখানে পেট উল্টে বমি আসে সেখানে করে তারা ফটোগ্রাফি!
ট্রেন দেরি করে আসলো। আমাদের সবার সিট ছিল না। ৪টা সিট ছিল। অচ বন্ধুরা মজা করতে জানে ঠিকই। কিন্তু মাঝে মাঝে তাদের মাথায় যেন কি হয়। সে কি হওয়ার খেসারত দিলো সৌরভ! পাশে বসা এক লোকের পকেটে কিছু একটা বড় দেখে সে লোকটাকে প্রভাত মনে করে, অন্যের পকেটে হাত দিয়ে জিজ্ঞাসা করে বসে, এটা এতো বড় ক্যান! সৌরভ তো বোকা হইলই সাথে আমরাও বিব্রত।

আমাদের দোলা আপার ছাওয়াল তাকে একটা সিটে বসাই রাখা হইছে। সে যাতে বাইর হইতে না পারে সেজন্যই রাখা ছিল কড়া নিষেধাজ্ঞা। শাহরিয়ার আদিব আর অপূর্বকে দেয়া ছিল অন্য দিকের সিট। তারা আরামেই ছিল। নাজমুল পুরো ট্রেন চলার সময় টেকা ধার কইরা মাস্ক কিনা হেল্পারগিরি করছে। ট্রেনের দরজার সামনে দাড়াইয়া ছিল। বার বার না করা সত্ত্বেও সে হেল্পারগিরি ছাড়ে না। বয়স হয়েছে। তাই দিপুকে বলেছিলাম ওকে ধুলা বালি খাইতে দেও। পায়ে পীড়ন অনুভব হলে যথাসময়ে সিট এর জন্য হাসফাশ করবে। শেষের দিকে হয়েছিল তাই
শেষের দিকে প্রচন্ড ভিড় ছিল। এর মধ্যে যুদ্ধ করেই শ্রীপুর স্টেশন নামতে হয়। নামার পর পরই দুজন সদস্যের প্রাকৃতিক ডাক আসে। বিষয়টা বলছি এজন্য, একজন এর কমনসেন্স পারলে স্টেশনেই কাজ করে দিয়েছেন। আরেকজন এতো অন্ধকারে আর দূরে গিয়ে কাজ সারলেন যে আমরা ভয় পেয়েছিলাম যদি আবার হারায় যায়। খেয়াল রাখতে হবে, প্রথমোক্ত জনকে চাইলে ওখানকার লোকজন বকে দিতে পারতো। তার কপাল ভালো কেও কিছু বলে নাই।

সিএনজি ঠিক করা হল। এখনকার সর্দার দিপু। দিপু যা বলে আমরা তাই শুনি। কয়েকজন এর আগে শ্রীপুর আসলেও পথ ঘাট সব ভুলে গেছেন। দুটি সিএনজিতে ১০ জন উঠে আমরা রওনা হলাম তরণীর ভিটা অভিমুখে। তখন সন্ধ্যা শেষ হয়েছে মাত্র। ২০-৩০ মিনিট পর আমাদের স্পটে আসলাম। মাঠে বিশাল পলিকাপড় বিছানো হল। যাতে শিশির-কুয়াশায় জিনিসপাতি না ভিজে। ৩টা তাবু থাকলেও ২টা সেট করা গেল। হালকা খাবার বিস্কুট কলা খাওয়া হল। আমরা ক্লাবের প্রোগ্রামগুলোতে সাধারণত বাংলা কলা কিনি। কে যে বিরাট বিরাট পছা কলা কিনছিল!
রাতের আকাশে এতো তারা দেখা হয় না অনেক দিন। ভুলেই গেছি শেষ কবে এতো তারা এক সাথে দেখিছি। নেবুলার ছবি তোলা এবং স্ট্যাকিং করা সম্পর্কে বলা হল। উল্কাপাত পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে বলা হল। যে যার মতন কাজ শুরু করলো। আমি এদিক সেদিক ঘুরলাম মাঝে মাঝে টেলিস্কোপ এ আকাশ দেখলাম। তারা দেখলাম। তাবুতে শুয়েও ছিলাম।

কুয়াশা আর শিশির থাকার কারণে ক্যাম্প দীর্ঘ করা হল না। প্ল্যান এ পরিবর্তন আনা হল। এদিকে ফোন এ জানা হয়ে গেল বেনু ভাই আসছেন না। আমরা ১০টার দিকের খানা দানা সমাপ্ত করলাম। বেনু ভাই এর লোকজন খাবার দাবার নিয়ে এসেছিল। নানা রকম ভর্তা, সবজি, মুরগির মাংস আর ডাল ছিল আইটেম। ডিম ভর্তা আমার বরাবরই ভালো লাগে। তথনই খ্রাপ লাগে নাই। সবাই খাবার দাবার যথেষ্ট পরিমাণ নষ্ট করে পেট পূজা শেষ করলাম। মিষ্টি স্বাদের আমড়া খাওয়া হল। এরই মধ্যে ২টা উল্কাপাত আমি দেখিছি।

এরপর ভটভটি আনা হল। সেখানে মালামাল সব উঠিয়ে আমরা বাঘের বাজারের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। ভটভটি উচুনিচু আর কাঁদা রাস্তায় খুব ভালো চলে না। সেজন্য সদস্যদের ঠ্যালা দিতে হয়। সেই ঠ্যালাঠুলো করতে আর বীরত্ব দেখাতে গিয়ে মোটামুটি সবাই কাদায় মাখামাখি হয়েছিলেন। তখন রাত ১২টার মতন। আশপাশে গাছপালা ছাড়া কিছুই নাই। অনেক কষ্ট করে বসে ভটভটিতে বাঘের বাজার বেনু ভাইয়ের বাসায় পৌছানো গেল। সবাই ফ্রেশ হয়ে নিল। কেও গেল উল্কাপাত পর্যবেক্ষণে আর কেও গেল ঘুমাতে। আমি মোটমাট ৩টা উল্কা দেখার পর ঘুমানোকেও উত্তম মনে করলাম। পরে শুনলাম সর্বোচ্চ ৩৫টা উল্কাপাত দেখেছেন আমাদের একজন। আরেকজন ১৫টা। বাকীরা ছবি তোলাতে ব্যস্ত থাকায় উল্কাপাত বেশি দেখতে পারেন নাই।

ঘুমাচ্ছিলাম। ৪টার দিকে হৈ চৈ এ ঘুম ভেঙ্গে যায়। শাহরিয়ার ঘুমানোর জায়গা পাচ্ছে না। সেজন্য হৈচৈ হচ্ছে। এর আগে আরাফাত আর অপূর্ব মিলে যারা ঘুমাচ্ছিল তাদের ঘুম ভাঙ্গছে। খুব বিরক্ত হচ্ছিলাম। কথা না শুনলে যা হয় তাই হয়েছে প্ল্যান বি এর পরিকল্পনা যেহেতু আমার মাথায় ছিল পরিবর্তন করে নিয়েছি সাথে সাথে। বার বার বলার পরও অট্টহাসি আর হৈচৈ। খুব বেশি বাড়াবাড়ি হয়েছে। যা একেবারে পছন্দ হয় নাই।
সকাল সাতটা সাড়ে সাতটায় উঠার পর, সবাইকে তাড়া দিয়ে সকালের খাবার খাওয়াইয়া বিদায়। প্ল্যান বি সংক্ষিপ্ত করা হয়ে গেছে এর মধ্যে। আরাফাতকে সর্দার বানাইয়া হৈ চৈ টিমকে ঢাকার উদ্দেশ্যে বাসে উঠায় দিয়ে আমি আর দিপু রয়ে গেলাম শ্রীপুর। উদ্দেশ্য বিয়ে খেতে নয় প্ল্যান বি বাস্তবায়ন।

আর হ্যাঁ বলতে ভুলে গেছি, কারা জ্যোতির্বিজ্ঞান এ সিরিয়াসলি কাজ করবে সেটা কিন্তু জানা হয়ে গেছে এখন এসাইনমেন্ট রিপোর্ট এর অপেক্ষায় আছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *