আপনার ছেলেটাকে একটা ছোট্ট দেখে লাল টুকটুকে ফুটবল কিনে দেন

অনেক আগের কথা। ছোট বেলার কথা। সব মনে নাই। আব্বু মাঝে মধ্যেই দেরি করে ফিরতেন। অন্য বাবাদের মতন, আব্বুও আমার জন্য এটা ওটা কিনে আনতেন। একবার এক রাতে কিনে আনলেন ফুটবল। বড়দের ফুটবলের মতন ছিল না ওটা। নরম চামড়ার ছিল। একটা গন্ধ ছিল সেটা এখনো মনে করতে পারি। ফুটবলটার রং ছিল লাল। সাদা-কালোর বদলে ছিল পঞ্চভুজ আকৃতির লাল-কালো। তখন ঢাকাতে আসছি নতুন। তেমন কাওকে চিনি না। মিশিও না কারো সাথে। মিশতে বারণ ছিল বাইরের সবার সাথে। ছেলে ধরার উৎপাত ছিল। হারিয়ে যাবার ভয় ছিল। খেলার জায়গা ছিল ছোট্ট বারান্দা। আপুরা থাকতো টাংগাইল। ছোটন তখনও আসেই নাই। আমি একলা গোল পোস্ট বানিয়ে খেলতাম। কখনও আব্বু সাথে থাকতো।

বাসা পাল্টানো হল। নতুন বাসার সামনে বেশ খানিকটা ফাঁকা জায়গা পাওয়া গেল। ফাঁকা জায়গা পাওয়াতে আমার খেলার সমস্যা সমাধান হল বটে। কিন্তু মাটিতে এই বল দিয়ে খেলতে খেলতে বলের একপাশ ক্ষয়ে যেতে থাকে। ঐ সময় আলমগীর নামে খেলার সাথীও জুটে যায়। সমস্যা হলো এক সময়। ফুটবলটার এক পাশ ক্ষয়ে গিয়ে ব্ল্যাডার বের হয়ে গেল খানিকটা। এভাবে খেলতে খেলতে এক তলা ছাদে গিয়ে বলটা আটকে গেল। বলটা আর নামানো হল না। নষ্ট হয়ে গেছে, ক্ষয়ে গেছে বলে। আমি তখন ছাদে উঠতেও পারি না। সিঁড়ি নাই। কিন্তু আলমগীর উঠতে পারতো।

অনেক দিন পর দেখলাম, পাশের খালি ঘরে পাড়ার ছেলেরা ছোট্ট একটা নরম বল দিয়ে খেলছে। সেখানে আলমগীরও ছিল। বুজতে সেদিন বাকী ছিল না, আলমগীর পরে বলটা নামিয়ে ব্ল্যাডার বের করে অন্যদের সাথে খেলছে। আমার মন খারাপ হয়েছিল। বাবাকে বলেছিলাম। বাবা অন্য কিছু হয়তো এনে দিয়েছিলেন। কিন্তু ফুটবল আর কেনা হয় নি। আমার ইচ্ছাও হয় নি। পরে আমি ভেবেছি, আলমগীর তো আমার সাথেই খেলতো! কেনইবা ও এরকম করলো? আমি উত্তর হয়তো পেয়েছি। তার নিজের একটা ফুটবল দরকার ছিল বলেই সে প্রতারণার আশ্রয় নেয়। এই সমাজ তাকে চুরি করতে শেখাইছে। প্রতারিত করতে শেখাইছে, সেই ছোটবেলাতেই। বড় হয়ে হয়তো সেই এই প্রতারণার আশ্রয়ই নিবে।

আমি বলছি না, আলমগীর অনেক দোষ করছে। সমাজ খারাপ। হ্যান ত্যান। আমি বলছি, আপনার ছেলেটাকে একটা ছোট্ট দেখে লাল টুকু টুকে ফুটবল কিনে দেন। সে হয়তো পাশের বাসায় কোন ছেলের ফুটবল দেখে সবার অলক্ষ্যে মন খারাপ করে। কিন্তু বলে না। বা বললেও ইচ্ছা পূরণ হয় না। ছোটদের ইচ্ছা ছোট হলেও, তার ফল অনেক দূর গড়ায়। একটা ফুটবল এর দাম কত হতে পারে? ২শ-৩শ টাকাই তো। সবার অলক্ষ্যে ছোট একটা কাজ, বাচ্চা এক ছেলের মনটা ভরে দিতে পারে। ভালোবাসা শেখাতে পারে। সেটা ২শ টাকায় পাওয়া যায় বটে; সময় ফুরালে লাখ টাকা দিয়েও কেনা যাবে না।

আমাদের এই সময়ে আমি অনেক বাবাদের চিনি। যারা সত্যি অসাধারণ বাবা। আমি অনেক মা দের চিনি। তারা অনেক অসাধারণ মা। এই অসাধারণ মা-বাবাদের দ্বারাই বদলে যাবে, আগামী আসছে যারা। আর এখানে আপনার ভূমিকাটুকু, খুব সামান্য। করে ফেলুন না। ফুটবলই হতে হবে এমন তো কোন কথা নাই, একটা সুন্দর ছবিওলা বই কিনে দেন। নিজের ছেলেকে দিতে হবে এমন কোন কথা নাই। পাশের ফ্ল্যাটের কাওকে দেন। আমাদের সমাজে, আমরা ঘৃণা দিতে শিখেছি। এখন চেষ্টা করি ভালোবাসা দিতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *